দিল্লি উত্তালই! রাজপথে রাজত্ব বিরোধীদের, জ্ঞানেশের সঙ্গে নিশানায় সাংবাদিককে ‘যৌন হেনস্থাকারী’ এক পুলিশকর্তাও

0

জ্ঞানেশের পদত্যাগের দাবিতে অশোক রোডের কাছে মিছিল করছিল আইসা। সেখান থেকে আটক করা হয় আইসা-র জাতীয় সভাপতি নেহা বোরাকে। কোনও রকম মহিলা কনস্টেবলকে ছাড়াই তাঁকে আটক করা হয় বলে অভিযোগ।জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবির সঙ্গে জুড়ল যৌন হেনস্থায় অভিযুক্ত পুলিশ আধিকারিকের বিরুদ্ধে পদক্ষেপের দাবিও। ছাত্র এবং নাগরিক সমাজের বিক্ষোভে শুক্র এবং শনিবারের পর রবিবারও উত্তাল হল দিল্লি।

রবিবার দিল্লির যন্তর মন্তরে যাওয়ার কথা ছিল দু’টি মিছিলের। প্রথমটির ডাক দিয়েছিল নাগরিক সমাজ। আর দ্বিতীয়টি কংগ্রেসের যুব সংগঠন যুব কংগ্রেস। যন্তর মন্তরমুখী জোড়া কর্মসূচির আগে নিরাপত্তার চাদরে মুড়ে ফেলা হয় গোটা এলাকা। মোতায়েন করা হয় ৫০০০ পুলিশ, র‌্যাফ, এবং আধাসামরিক বাহিনী। ব্যারিকেড বসানো হয় টলস্টয় মার্গ, জনপথ রোড, সংসদ মার্গ, কেরল ভবনের দিকে।

তবে মিছিল শুরুর আগেই দুপুরে পার্লামেন্ট স্ট্রিট থানার বাইরে বিক্ষোভ কর্মসূচি শুরু করে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)। পরে তাতে শামিল হয় বাম দলগুলিও। বেশ কয়েকজন সাংবাদিক থানার সামনে অবস্থানে বসেন। মহিলা সাংবাদিককে যৌন হেনস্থায় অভিযুক্ত পুলিশ আধিকারিকের বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের করার দাবি জানান তাঁরা।

প্রসঙ্গত, তিন মহিলা সাংবাদিক অভিযোগ করেছেন, শনিবার যন্তর মন্তরে খবর করতে গিয়ে তাঁরা যৌন হেনস্থার শিকার হয়েছেন। তাঁরা দিল্লি পুলিশের এসিপি বিবেক ভগতের বিরুদ্ধে অভিযোগের আঙুল তুলেছেন। এফআইআর দায়ের করার আর্জি জানিয়ে পার্লামেন্ট স্ট্রিট থানায় গিয়ে পুলিশের সঙ্গে কথা বলেন সিজেপি-র সৌরভ দাস, সিপিএমের বৃন্দা কারাট। তার পরেও পুলিশ অভিযুক্ত এসিপি-র বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের করেনি বলে অভিযোগ। সিজেপি-র অভিযোগ পুলিশ ওই অভিযুক্ত আধিকারিককে বাঁচানোর চেষ্টা করছে।

পার্লামেন্ট স্ট্রিট থানার সামনে যখন বিক্ষোভ চলছে, সেই সময়ই জ্ঞানেশের ইস্তফার দাবিতে ইন্ডিয়া গেটের দিকে মিছিল করে এগোতে থাকেন আম আদমি পার্টি (আপ)-র কর্মীরা। আটক করা হয় দলের নেতা সৌরভ ভরদ্বাজকে। ছাত্র সংগঠন আইসা, কংগ্রেসের ছাত্র সংগঠন এনএসইউআই-ও বিক্ষোভে শামিল হয়। জ্ঞানেশের পদত্যাগের দাবিতে অশোক রোডের কাছে মিছিল করছিল আইসা। সেখান থেকে আটক করা হয় আইসা-র জাতীয় সভাপতি নেহা বোরাকে। কোনও রকম মহিলা কনস্টেবলকে ছাড়াই তাঁকে আটক করা হয় বলে অভিযোগ। পরে অবশ্য নেহা এবং আটক হওয়া বাকিদের ছেড়ে দেওয়া হয়।

নেহার পাশাপাশি আটক করা হয় স্বাধীন সাংবাদিক রোজ়িকে। দিল্লি পুলিশের এসিপি বিবেকের বিরুদ্ধে এফআইআর দায়েরের দাবিতে শনিবার রাত থেকে বিক্ষোভ দেখাচ্ছিলেন তিনি। নেহা এবং রোজ়ি আটক হওয়ার পরেই সমাজমাধ্যমে একটি পোস্ট করে সিজেপি প্রধান অভিজিৎ দীপকে লেখেন, “দিল্লি পুলিশ আরও একবার কাপুরুষতার পরিচয় দিল। গতকাল রোজ়ি এসিপি বিবেক ভগতের দ্বারা নিগ্রহের শিকার হয়। অথচ ওই বিকৃতমনস্কের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ না-করে পুলিশ রোজ়িকে আটক করল। দারুণ নারী ক্ষমতায়ন হচ্ছে নরেন্দ্র মোদী।”

মহিলা সাংবাদিকদের নিগ্রহের অভিযোগকে সামনে রেখে কেন্দ্র এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের নিয়ন্ত্রণাধীন দিল্লি পুলিশের উপর চাপ বাড়ানোর কৌশল নিয়েছে কংগ্রেসও। কংগ্রেস নেত্রী প্রিয়ঙ্কা গাঁধী বাড্রা সমাজমাধ্যমে লিখেছেন, “যে পুলিশের কাজ নিরাপত্তা জোগানো, সেই পুলিশের জন্য মহিলারা অসুরক্ষিত বোধ করছেন। কলেজপড়ুয়া থেকে সাংবাদিক— মহিলা সব জায়গায় নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। নরেন্দ্র মোদীজি, অমিত শাহজি মহিলাদের সঙ্গে কি এই ধরনের আচরণ করতে হয়?”

অন্য দিকে, জ্ঞানেশের বিরুদ্ধে বিক্ষোভও অব্যাহত রয়েছে। কংগ্রেসের তরফে হুঁশিয়ারির সুরে বলা হয়েছে, “আমরা বিশ্বাসঘাতক জ্ঞানেশকে জেলে পাঠাব।” জ্ঞানেশকে অপসারণের দাবিতে রবিবার মহারাষ্ট্রে শক্তিপ্রদর্শন করেন ঠাকরে ভাইয়েরা। দক্ষিণ মুম্বইয়ের মেট্রো সিনেমা থেকে মিছিলে হাঁটেন বালাসাহেব ঠাকরের পুত্র উদ্ধব এবং ভ্রাতুষ্পুত্র রাজ। মিছিল শেষ হয় বৃহন্মুম্বই পুরনিগমের সামনে গিয়ে। মিছিল শেষের সভা থেকে রাজ ঠাকরে দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে কটাক্ষ করে বলেন, “জ্ঞানেশ কাকা, ভোট চুরি কোরো না।” উদ্ধব এবং রাজ দু’জনেই জ্ঞানেশের পদত্যাগের পাশাপাশি মহারাষ্ট্রে এসআইআর বাতিল করার দাবি জানান। রাজের অভিযোগ, ২০২৪ সালে মহারাষ্ট্রে বিধানসভা ভোটের আগে ৪০ থেকে ৬০ লক্ষ ভোটারের নাম ভোটার তালিকায় ঢুকিয়ে নির্বাচনে জিতেছিল বিজেপি। আবার নিজেদের সুবিধার জন্য তারা এসআইআর-এ মহারাষ্ট্রের ২ কোটি ভোটারের নাম বাদ দিয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

গোটা দেশে জ্ঞানেশ-বিরোধী বিক্ষোভের মধ্যেই দেশের বর্তমান মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের র বিরুদ্ধে পুরনো মামলায় তদন্ত শুরুর নির্দেশ দিয়েছে কেরলম সরকার। অভিযোগ, ওই রাজ্যের পূর্ত দফতরের সচিব থাকাকালীন জ্ঞানেশ একাধিক অনিয়মের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। তাঁর সময়ে কেরলমের স্টেট ট্রান্সপোর্ট প্রজেক্টের (কেএসটিপি) সঙ্গে যুক্ত এক মালয়েশীয় আধিকারিক আত্মঘাতীও হয়েছিলেন। তদন্ত শুরু হলেও আচমকা তা বন্ধ হয়ে যায় বলে অভিযোগ। কেরলমের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রমেশ চেন্নিথালা নতুন করে ওই মামলার তদন্ত শুরুর নির্দেশ দিয়েছেন রাজ্যের ভিজিল্যান্স অ্যান্ড অ্যান্টি কোরাপশন ব্যুরোর ডিরেক্টরকে। মামলাটিতে বহিরাগত কোনও প্রভাব ছিল কি না, দেখতে বলা হয়েছে।

ইংরেজি দৈনিক ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর প্রতিবেদনের পর মুখ্য নির্বাচনের পদ থেকে জ্ঞানেশের ইস্তফার দাবি আরও জোরালো হয়েছে। দুই নির্বাচন কমিশনারের আপত্তি উপেক্ষা করে এসআইআর সংক্রান্ত একাধিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ। একাধিক পদক্ষেপকে বাকি দু’জন কমিশনার বেআইনি বলে উল্লেখ করেছিলেন। গত ১০ মাসে নির্বাচন কমিশনের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও পদক্ষেপের বিরুদ্ধে অন্তত ১৪ বার লিখিত আপত্তি জানিয়েছিলেন দুই নির্বাচন কমিশনার।

জ্ঞানেশের পদত্যাগের দাবিতে দেশ জুড়ে আন্দোলনে নেমেছে তরুণ প্রজন্ম এবং বিজেপি বিরোধী রাজনৈতিক শিবির। ককরোচ জনতা পার্টি জানিয়েছে, জ্ঞানেশ ইস্তফা না দিলে ১০ অক্টোবর দিল্লির যন্তর মন্তরে ফের বিক্ষোভ দেখানো হবে। সারা দেশের তরুণ প্রজন্মকে ওই মিছিলে শামিল হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে সিজেপি। বোঝাই যাচ্ছে, আগামী কয়েকদিন জ্ঞানেশ-বিরোধী বিক্ষোভে সরগরম থাকবে দেশের রাজধানী।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed