ফুল বদলে রাজ্যসভায় ফেরার পথে কোয়েলও, বিজেপি নাম ঘোষণা করতেই বিরোধীদের বিদ্রুপ, পাত্তাই দিচ্ছে না পদ্ম

0

বিধানসভা ভোটে তৃণমূল পর্যুদস্ত হওয়ার পর রাজ্যসভা থেকে একে একে পদত্যাগ করেন সুখেন্দুশেখর রায়, সুস্মিতা দেব এবং প্রকাশচিক বরাইক। তিন রাজনীতিক এখন বিজেপির রাজ্যসভার সাংসদ। বাকি ছিলেন কোয়েল।নিজের ছেড়ে দেওয়া আসনেই প্রার্থী হলেন অভিনেত্রী কোয়েল (রুক্মিণী) মল্লিক। শুধু বদলে গেল প্রতীক। গত এপ্রিলে তিনি ছিলেন তৃণমূলের রাজ্যসভার সাংসদ। অক্টোবরে হলেন বিজেপি মনোনীত প্রার্থী। প্রার্থী হিসেবে বিজেপি পর্দার ‘মিতিনমাসি’র নাম ঘোষণা করতেই কটাক্ষ শুরু করেছে বিরোধীরা। তবে সে সব গায়ে মাখতে নারাজ পদ্মশিবির।

বিধানসভা ভোটের পর পশ্চিমবঙ্গ থেকে বিজেপির রাজ্যসভার সদস্য বেড়ে হয়েছে ছয়। কোয়েল সাংসদ হলে সংখ্যাটা দাঁড়াবে সাতে। বিধানসভা ভোটের আগে রাজ্যসভায় তৃণমূলের সদস্য ছিল ১৩। এখন ৯-এ।

বস্তুত, বিধানসভা ভোটে তৃণমূল পর্যুদস্ত হওয়ার পর সংসদের দুই কক্ষেও ঘাসফুলের মধ্যে ‘বিদ্রোহ’ বাধে। রাজ্যসভা থেকে একে একে পদত্যাগ করেন সুখেন্দুশেখর রায়, সুস্মিতা দেব এবং প্রকাশচিক বরাইক। তিন রাজনীতিক এখন বিজেপির রাজ্যসভার সাংসদ। বাকি ছিলেন কোয়েল। তৃণমূলের সদস্য হিসেবে রাজ্যসভা থেকে পদত্যাগ করা অভিনেত্রীকেও প্রার্থী করেছে বিজেপি। আগামী ১৬ অক্টোবর, দুর্গাপুজোর ষষ্ঠীর দিন রাজ্যসভার উপনির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গ থেকে আবার প্রার্থী কোয়েল।

কোয়েলের রাজনৈতিক জীবন শুরু চলতি বছরেই। গত ২৬ ফেব্রুয়ারি তাঁকে রাজ্যসভার প্রার্থী হিসাবে ঘোষণা করে তৃণমূল। ১৬ মার্চ নির্বাচনে জয়ী হন। ৬ এপ্রিল রাজ্যসভায় শপথ নেন। তা ছাড়া শ্রম, বস্ত্র এবং দক্ষতা উন্নয়ন কমিটির সদস্যও করা হয় তাঁকে। যদিও ওই দফায় সাংসদজীবন দীর্ঘস্থায়ী হয়নি কোয়েলের। একটি অধিবেশনেও যোগ দেননি। সাড়ে তিন মাসের মধ্যেই (১৬ জুলাই) রাজ্যসভার সদস্যপদ থেকে ইস্তফা দেন। রাজ্যসভার চেয়ারম্যান সিপি রাধাকৃষ্ণনের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেওয়ার পরে প্রকাশ্যে কোনও মন্তব্য করতে চাননি।

তবে কোয়েলকে যে এ বার বিজেপি রাজ্যসভায় পাঠাতে পারে, এমন জল্পনা ছিলই। সাংসদপদে ইস্তফা দেওয়ার পরপরই কোয়েলের সঙ্গে বৈঠক হয় নরেন্দ্র মোদীর মন্ত্রিসভার সদস্য, প্রবীণ বিজেপি নেতা ভূপেন্দ্র যাদবের। তার আগে লোকসভায় তৃণমূলের ‘বিদ্রোহী’ সাংসদেরা (যাঁরা পরে এনসিপিআই) ওই সময়ে একাধিক বার বৈঠকে বসেছিলেন ভূপেন্দ্রের বাড়িতে। উত্তমকুমারের জন্মশতবর্ষের সরকারি অনুষ্ঠানে কোয়েলের বাবা প্রবীণ অভিনেতা রঞ্জিত মল্লিককে হাত ধরে মঞ্চে তুলেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।

বিরোধীদের প্রতিক্রিয়া

এখন কোয়েলকেই বিজেপি রাজ্যসভার প্রার্থী করায় দুই তৃণমূল শিবিরে ভিন্ন প্রতিক্রিয়া। ঋতব্রত তৃণমূল বা গণতান্ত্রিক তৃণমূল কংগ্রেসের নেতা বিধানসভার বিরোধী দলের মুখ‍্যসচেতক আখতারুজ্জামান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে দুষেছেন। তাঁর কথায়, ‘‘যাঁরা রক্ত-ঘাম দিয়ে সিপিএমের বিরুদ্ধে লড়াই করে, জীবন বাজি রেখে তৃণমূলকে ক্ষমতায় এনেছিলেন, তাঁদের খেয়াল রাখেননি উনি। কোথাকার কোন তারকা, কোন শিল্পপতি, বিদেশ থেকে আমদানি করা লোকজনকে রাজ্যসভায় পাঠিয়েছিলেন। কোয়েল মল্লিক তাঁদের মধ্যে একজন। তিনি অভিনেত্রী। মমতা তৃণমূল নেতা-কর্মীদের বঞ্চিত করে তাঁকে রাজ্যসভায় পাঠিয়েছিলেন। এখন সময় বুঝে তাঁরা তো বিজেপিতে যাবেনই।’’ আবার আখরুজ্জামানের সন্দেহ, কোয়েলকে বিজেপির প্রার্থী হিসেবে রাজ্যসভায় পাঠানোর সিদ্ধান্তের নেপথ্যেও কোথাও মমতা রয়েছেন! তিনি ‘সেটিং’ তত্ত্ব এনেছেন।

মমতা তৃণমূলের বিধায়ক তথা মুখপাত্র কুণাল ঘোষ বিজেপি-কে কটাক্ষের পাশাপাশি কোয়েলের ‘বিশ্বাসঘাতকতা’ এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘ভুল সিদ্ধান্ত’ নিয়ে মুখ খুলেছেন। তিনি বলেন, ‘‘সেই একই— দল ভাঙানোর খেলা। সেই তৃণমূল থেকে লোক ভাঙিয়ে টিকিট দেওয়া। তৃণমূলকেই গালিগালাজ করব, আবার তৃণমূলের লোকজনকেই দলে টেনে টিকিট দেব, একে রাজনৈতিক দ্বিচারিতা ছাড়া অন্য কিছু বলতে পারছি না।’’ তিনি আরও বলেন, ‘‘কোয়েলের বাবা রঞ্জিত মল্লিককে কলকাতার শেরিফ করেছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কোয়েলকে রাজনীতিতে নিয়ে এসে সরাসরি রাজ্যসভায় পাঠিয়েছিলেন। এত কিছুর পরেও যদি কেউ এ ভাবে বিশ্বাসঘাতকতা করেন, তা হলে তো রাজনৈতিক দলগুলোর ভরসা উঠে যাবে রাজনীতির বাইরের লোকেদের উপর থেকে। রাজনৈতিক দলগুলি যে উদারতা দেখায়, অনেক ক্ষেত্রে দলের একনিষ্ঠ কর্মীদের পাশে সরিয়ে রেখে যে ভাবে অন্য ক্ষেত্রের লোকজনকে টিকিট দিয়ে সম্মান প্রদর্শন করে, এর পরে তো সেই উদারতা দেখাতে রাজনৈতিক দলগুলি ভয় পাবে।’’

আবার রাজনীতির বাইরের জগতের একগুচ্ছ মুখকে তথা খ্যাতনামীদের বিভিন্ন নির্বাচনে টিকিট দেওয়ার যে প্রবণতা মমতার রাজনীতিতে বরাবর দেখা গিয়েছে, তা নিয়েও অনুযোগ জানিয়েছেন কুণাল। তিনি বলেন, ‘‘মমতাদিরও ভাবা উচিত, তাঁর এই সব সিদ্ধান্ত কতটা ঠিক ছিল। সারাবছর যাঁরা দলের কাজে থাকেন, তাঁদের বদলে এই ভাবে গ্ল্যামার দুনিয়া থেকে লোকজন খুঁজে এনে টিকিট দেওয়ার ফল কী হয়, নিশ্চয়ই মমতাদি বুঝতে পারছেন।’’

কোয়েল প্রসঙ্গে সিপিএম নেতা সুজন চক্রবর্তীর কটাক্ষ, ‘‘তৃণমূলের প্রাক্তন মানেই বিজেপির বর্তমান। এটাই স্বাভাবিক রীতি এখন। এর আগে তৃণমূলের তিন রাজ্যসভার সদস্য পদত্যাগ করে আবার বিজেপি থেকে রাজ্যসভার গিয়েছেন। ধারা বজায় রয়েছে।’’ তিনি আরও বলেন, ‘‘প্রকাশচিক বরাইক যদি হতে পারেন, যদি হতে পারেন সুখেন্দুশেখর রায় অথবা সুস্মিতা দেব, তবে কোয়েলই বা কেন নন। আসলে এটাই এখন তৃণমূল-বিজেপির অভ্যন্তরীণ রসায়ন। এখন প্রাক্তন তৃণমূল হলে বিজেপিতে গুরুত্ব বেশি। বিজেপিতে আদি বিজেপি নেতাদের গুরুত্ব কম।’’

বিজেপির জবাব

বিরোধীদের এ হেন আক্রমণকে গুরুত্ব দিতে চাইছে না বিজেপি। সুজন চক্রবর্তীর মন্তব্য প্রসঙ্গে বিজেপির রাজ্যসভার রাহুল সিংহ বলেন, ‘‘আমাদের দলে কার দাম রয়েছে, কার নেই, সে সব বিচার করার আগে সুজনবাবুদের জিজ্ঞাসা করুন, ওঁর নিজের দলে ওঁর কতটুকু দাম রয়েছে। আমি যত দূর জানি, ওঁর নিজের দলেই তো ওঁকে কেউ পাত্তা দেয় না।’’

অতঃপর

কোয়েল যে দিন রাজ্যসভার পদ ছাড়েন, সে দিন ছিল রথযাত্রা। তাঁর অভিনীত ‘স্বার্থপর’ ছবির পোস্টার দিয়ে খোঁচা দিয়েছিলেন কৃষ্ণনগরের সাংসদ মহুয়া মৈত্র। কোয়েল এ বার বিজেপি মনোনীত প্রার্থী। কাকতালীয়। তবে তাঁর আগামী ছবির নাম ‘স্পর্ধা’।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed