৭৪ জন বিধায়ক বাদ, ১৫ জন বিধায়কের কেন্দ্রবদল! তৃণমূলের প্রার্থিতালিকা তৈরিতে মাপকাঠি গত পাঁচ বছরের ‘পারফরম্যান্স’

0
৭৪ জন বিধায়ক বাদ, ১৫ জন বিধায়কের কেন্দ্রবদল!

৭৪ জন বিধায়ক বাদ, ১৫ জন বিধায়কের কেন্দ্রবদল!

২০২৪ সালের লোকসভা ভোটে বিজেপির চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি আসন পেলেও দেখা গিয়েছিল শহর এবং আধা-শহরগুলিতে তৃণমূলের সমর্থনের ভিত কিছুটা আলগা হয়েছে। প্রার্থিতালিকায় দেখা যাচ্ছে, ওই সব এলাকাতেই ছাঁটাই হওয়া বিধায়কের সংখ্যা বেশি।তিনি মনে করেন, ‘কাজ করো, নইলে রাস্তা দেখো!’ পেশাদার সংস্থার ভাষায় যাকে বলা হয়, ‘পারফর্ম অর পেরিশ!’সেই নীতিতেই তিনি দল পরিচালনা করে থাকেন। তাঁর কোনও ‘কাছের লোক’ নেই। ‘কাজের লোক’ আছে। গত লোকসভা ভোটের পরেও ফলাফলের নিরিখে তিনি বিভিন্ন এলাকার পুরসভায় শীর্ষপদে বদল এনেছিলেন। মঙ্গলবার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যখন কালীঘাটের দফতর থেকে বিধানসভা ভোটের প্রার্থিতালিকা ঘোষণা শুরু করছেন, তখন তিনি দলনেত্রীর বাঁ পাশে নীরবে বসে। কিছু নাম ঘোষণার পরে মমতা তাঁর হাতেই বাকি তালিকা ঘোষণার ভার তুলে দিলেন।বাকি আসনগুলির প্রার্থীদের নাম তিনিই ঘোষণা করলেন। ঠিকই করলেন। কারণ, চতুর্থ বার সরকার গঠনের জন্য রাজ্যের শাসকদল তৃণমূল যে প্রার্থিতালিকা ঘোষণা করল, তাতে তাঁর নীতির ছাপ ছত্রে ছত্রে স্পষ্ট। তিনি— অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক। দলের অন্দরে যাঁকে ‘সেনাপতি’ বা ‘ক্যাপ্টেন’ বলে ডাকা হয়ে থাকে। একাধিক দলীয় সভায় জনপ্রতিনিধি এবং সাংগঠনিক পদাধিকারীদের যিনি বার্তা দিয়েছেন, কাজ করলে পদে থাকুন। না হলে বিকল্প খুঁজুন। ‘পারফর্ম অর পেরিশ!’০২৬ সালের বিধানসভা ভোট তৃণমূলের কাছে ‘অগ্নিপরীক্ষা’। ১৫ বছরের স্থিতাবস্থা বিরোধিতার বোঝা মাথায় নিয়ে তাদের যেতে হচ্ছে জনগণের দরবারে। এমন এক পরীক্ষায় অভিষেক সে সব ছাত্রকে পাঠাতে চাননি, যাঁরা সারা বছর পড়াশোনা করেননি। বদলে তিনি নতুন ছাত্র এনেছেন। তৃণমূলের প্রার্থিতালিকায় স্থান হয়নি দলের ৭৪ জন বিধায়কের! অনুপাতের হিসাবে যা ৩৩ শতাংশ। এমন ঘটনা তৃণমূলের ইতিহাসে অভূতপূর্ব। দলীয় সূত্রের খবর, আসন ধরে ধরে গত পাঁচ বছরের ‘পারফরম্যান্স’ বিচার করেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশিই, বর্তমান বিধায়কদের ১৫ জন (অর্থাৎ ৭ শতাংশ) টিকিট পেলেও তাঁদের এ বার নতুন কেন্দ্রে লড়তে পাঠিয়েছে দল। যাতে নতুন কেন্দ্রে তাঁদের পুরনো ‘ভাবমূর্তি’ বহন করতে না হয়।পারফরম্যান্সে’ বিশ্বাসী অভিষেক ‘কাজ করলে পদে থাকুন, নইলে রাস্তা দেখুন’ নীতি সংগঠনের অন্দরে অনেকাংশেই কার্যকর করেছেন। এ বার তৃণমূলের ‘সেনাপতি’ চান, সেই নীতি সরকার এবং প্রশাসনেও কার্যকর হোক। ১৫ বছরের প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার ‘চাপ’ এবং কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন বিজেপির আগ্রাসী প্রচারের মোকাবিলায় তিনি সেই সব নেতা-নেত্রীর উপরেই ভরসা রেখেছেন, যাঁরা গত পাঁচ বছর ধরে নিরবচ্ছিন্ন ভাবে সাংগঠনিক সক্রিয়তা দেখিয়েছেন। ২০২৪ সালের লোকসভা ভোটে বিজেপির চেয়ে তৃণমূল দ্বিগুণেরও বেশি আসন পেয়েছিল বটে। কিন্তু ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখা গিয়েছিল, শহর এবং আধা-শহর বা মফস্সলে তৃণমূলের সমর্থনের ভিত কিছুটা আলগা হয়েছে। ঘটনাচক্রে, মঙ্গলবার ঘোষিত প্রার্থিতালিকায় ওই সব এলাকাতেই ছাঁটাই-হওয়া বিধায়কের সংখ্যা বেশি।বর্তমান বিধায়কদের মধ্যে বাদ পড়া উল্লেখযোগ্য নাম মনোরঞ্জন ব্যাপারী (বলাগড়), সাবিত্রী মিত্র (মানিকচক), সৌমেন মহাপাত্র (তমলুক), কাঞ্চন মল্লিক (উত্তরপাড়া), মঞ্জু বসু (নোয়াপাড়া), দুলাল দাস (মহেশতলা), সূর্য অট্ট (নারায়ণগড়), অসিত মজুমদার (চুঁচুড়া), চিরঞ্জিত চক্রবর্তী (বারাসত), নির্মল ঘোষ (পানিহাটি), বিবেক গুপ্ত (জোড়াসাঁকো), নিয়োগ দুর্নীতি মামলায় গ্রেফতার মানিক ভট্টাচার্য (পলাশিপাড়া) এবং নিয়োগ দুর্নীতি মামলায় এখনও জেলবন্দি জীবনকৃষ্ণ সাহা (বড়ঞা)। চার মন্ত্রী মনোজ তিওয়ারি (হাওড়ার শিবপুর), বিপ্লব রায়চৌধুরী (পূর্ব মেদিনীপুরের পাঁশকুড়া-পূর্ব) এবং জোৎস্না মান্ডি (রানিবাঁধ), তাজমুল হোসেন (হরিশ্চন্দ্রপুর) টিকিট পাননি। রাজ্যের আর এক মন্ত্রী তথা বালিগঞ্জের বিদায়ী বিধায়ক বাবুল সুপ্রিয় সদ্য রাজ্যসভার সাংসদ হয়েছেন। প্রত্যাশিত ভাবেই প্রার্থিতালিকায় তাঁর নাম নেই।যে সব বিধায়কের কেন্দ্রবদল হয়েছে তাঁদের মধ্যে রয়েছেন শওকত মোল্লা (ক্যানিং পূর্ব থেকে ভাঙড়), রানা চট্টোপাধ্যায় (বালি থেকে শিবপুর), রত্না চট্টোপাধ্যায় (বেহালা পূর্ব থেকে বেহালা পশ্চিম), প্রাক্তন পুলিশকর্তা হুমায়ুন কবীর (ডেবরা থেকে ডোমকল), বিদেশ বসু (উলুবেড়িয়া পূর্ব থেকে সপ্তগ্রাম), সোহম চক্রবর্তী (চণ্ডীপুর থেকে করিমপুর) এবং রুকবানুর রহমান (চাপড়া থেকে পলাশিপাড়া)। মোট দেড়শো জন বিধায়কের প্রার্থিতালিকায় প্রত্যাবর্তন ঘটেছে। এঁদের মধ্যে ১৩৫ জনকে তাঁদের পুরনো আসনে প্রার্থী করা হয়েছে। অর্থাৎ, ৬০ শতাংশ বিধায়কের কেন্দ্রবদল হয়নি।

অভিষেক অনেক বারই সাংগঠনিক কার্যকলাপে ‘পারফরম্যান্স’ যাচাই করে প্রার্থী করার বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেছেন। তৃণমূলের ২৯১ জনের প্রার্থিতালিকায় ( দার্জিলিং, কালিম্পং এবং কাশিয়াং কেন্দ্র অনীত থাপার ভারতীয় গোর্খা প্রজাতান্ত্রিক মোর্চাকে ছেড়ে দিয়েছে তৃণমূল) সংগঠনের অন্দরে ‘পারফরম্যান্সে’র ভিত্তিতে টিকিট পাওয়ার নিরিখে উঠে আসছে কৈলাস মিশ্র (বালি), জাহাঙ্গির খান (ফলতা), তৃণাঙ্কুর ভট্টাচার্য (নোয়াপাড়া), দেবাংশু ভট্টাচার্য (চুঁচুড়া), রাজীব বন্দ্যোপাধ্যায় (ডেবরা), কুণাল ঘোষের (বেলেঘাটা) নাম। এঁদের মধ্যে অনেকেই দলের অন্দরে অভিষেকের ‘আস্থাভাজন’ বলে পরিচিত। প্রাক্তন সাংবাদিক দেবদীপ পুরোহিতকে খড়দহ কেন্দ্র থেকে টিকিট দেওয়া হয়েছে। বয়সে তরুণ দেবদীপ অর্থনীতির ছাত্র। মুখ্যমন্ত্রী ‘আস্থাভাজন’। তাঁকে রাজ্যের প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী অমিত মিত্রের পুরনো আসনে দাঁড় করিয়েছেন মমতা। যুবনেতা কৈলাস এবং ছাত্রনেতা তৃণাঙ্কুর বছরভরই সংগঠনের কাজে যুক্ত থাকেন। অভিষেকের ‘ঘনিষ্ঠ’ বলে পরিচিত জাহাঙ্গির বিভিন্ন নির্বাচনে সাংগঠনিক দক্ষতার প্রমাণ দিয়েছেন। অন্য দিকে, ২০২১ সালের বিধানসভা ভোটের আগে বিজেপিতে গিয়ে ডোমজুড়ে পরাস্ত হওয়া প্রাক্তন মন্ত্রী রাজীব ২০২২ সালের মধ্যপর্বে তৃণমূলে ফিরেছিলেন। গত সাড়ে তিন বছর ধরে প্রচারের আড়ালে থেকে সাংগঠনিক কাজ করে গিয়েছেন তিনি। আবার একদা দলের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হওয়া কুণাল গত কয়েক বছর ধরে ধারাবাহিক ভাবে সংবাদমাধ্যম এবং সামাজিক মাধ্যমে বিরোধীদের প্রচার মোকাবিলায় সামনের সারিতে ছিলেন।

৭৪ জন বিধায়ক বাদ, ১৫ জন বিধায়কের কেন্দ্রবদল!
৭৪ জন বিধায়ক বাদ, ১৫ জন বিধায়কের কেন্দ্রবদল!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed