সৌদি-তুরস্ক-দিয়েগো গার্সিয়ায় হামলা করে ইরানের ঘাড়ে দোষ? তেহরানকে প্যাঁচে ফেলতে ‘মেকি সংগ্রামে’ ইহুদি গুপ্তচরবাহিনী?

0

দ্ধের চতুর্থ সপ্তাহে পৌঁছে ইজ়রায়েলের বিরুদ্ধে একগুচ্ছ ‘ফল্‌স ফ্ল্যাগ’ অপারেশনের অভিযোগ তুলল ইরান। তেহরানের দাবি, লড়াইয়ে দল ভারী করতে একাধিক আরব রাষ্ট্র এবং দিয়েগো গার্সিয়ায় ‘মিথ্যা অভিযান’ চালিয়েছে ইহুদিদের গুপ্তচরবাহিনী মোসাদ।

প্রতিবেশী আরব রাষ্ট্রের তেল শোধনাগারে ড্রোনহামলা। কিংবা মার্কিন বোমারু বিমানের বহর গুঁড়িয়ে দিতে হাজার হাজার কিলোমিটার দূরের দ্বীপকে নিশানা করে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ। আমেরিকা ও ইজ়রায়েলকে শিক্ষা দিতে আদৌ কি এই সমস্ত আক্রমণ শানিয়েছে ইরানি ফৌজ, না কি এগুলির নেপথ্যে আছে ইহুদি গুপ্তচরবাহিনী মোসাদের কোনও গভীর ষড়যন্ত্র? পশ্চিম এশিয়ার লড়াই চতুর্থ সপ্তাহে পা দেওয়া ইস্তক সংশ্লিষ্ট ইস্যুতে তীব্র হচ্ছে ‘ফল্‌স ফ্ল্যাগ’ অপারেশনের জল্পনা।

সৌদি আরব থেকে দিয়েগো গার্সিয়া কিংবা বাহরিন। সম্প্রতি পশ্চিম এশিয়ার একাধিক দেশ এবং ভারত মহাসাগরীয় দ্বীপে হামলার প্রশ্নে মুখ খোলেন তেহরানের শিয়া ধর্মগুরু তথা সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনেই। একটি বিবৃতিতে ওই ঘটনাগুলিকে ইজ়রায়েলি ‘ফল্স ফ্ল্যাগ’ অপারেশন বলে চিহ্নিত করেছেন তিনি। ইরানি বিদেশ মন্ত্রকের দাবি, লড়াইয়ে পরাজয় নিশ্চিত বুঝে দল ভারী করতে চক্রান্তের জাল বিছোচ্ছে মোসাদ। মিথ্যা অভিযানের মাধ্যমে আরও কিছু দেশকে আরবের রণাঙ্গনে টেনে আনতে চাইছে তারা।

বিশ্বের সামরিক ইতিহাসে ‘ফল্স ফ্ল্যাগ’ অপারেশনের আলাদা গুরুত্ব রয়েছে। প্রাচীনকাল থেকেই এর বহুল ব্যবহার করে আসছেন দুঁদে সেনা অফিসারেরা। সংঘাত পরিস্থিতিতে অনেক সময় নিজেদের ছাউনি, সরকারি ভবন বা কোনও নিরপেক্ষ রাষ্ট্রের উপর আক্রমণের নির্দেশ দিয়ে থাকেন তাঁরা। পরে গোটা ঘটনার দায়ভার শত্রুর উপর চাপানোর পাশাপাশি এই নিয়ে চলে দেদার মিথ্যা প্রচার। এতে জাতীয়তাবাদে উদ্বুদ্ধ হয়ে ওঠে দেশের আমজনতা। পাশাপাশি আক্রান্ত রাষ্ট্রের থেকেও মেলে সাহায্য।ফৌজি পরিভাষায় এই ধরনের অভিযানগুলিকেই বলে ‘ফল্স ফ্ল্যাগ’ অপারেশন। ইজ়রায়েল এবং আমেরিকার বিরুদ্ধে যুদ্ধে এর গাদা গাদা অভিযোগ তুলেছে ইরান। উদাহরণ হিসাবে সৌদি আরবের রাস তানুরা খনিজ তেল শোধনাগার, রাজধানী রিয়াধের মার্কিন দূতাবাস-সহ পাঁচটি সরকারি ভবন এবং ওমানের দুকম বন্দরের দু’টি জায়গায় ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র আছড়ে পড়ার কথা বলা যেতে পারে। এগুলিকে ‘মিথ্যা অভিযান’ বলে উল্লেখ করে তেল আভিভের গুপ্তচর সংস্থা মোসাদের দিকে আঙুল তুলেছে তেহরান।

সংশ্লিষ্ট ইস্যুতে পশ্চিম এশিয়ার গণমাধ্যম ‘মিডল ইস্ট আই’কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বিস্ফোরক মন্তব্য করেছেন সাবেক পারস্যের বিদেশ মন্ত্রকের এক পদস্থ কর্তা। তাঁর কথায়, ‘‘প্রতিবেশী আরব দেশগুলিতে হওয়া বেশ কিছু হামলা আমাদের বাহিনী করেইনি। তবে সেগুলি হয়তো ইরানের ভূখণ্ড থেকেই হয়েছে। আর অবশ্যই তাতে জড়িতে আছে মোসাদ। বর্তমানে তাঁদের ড্রোন লুকিয়ে রাখার গোপন আড্ডাগুলির খোঁজ চালাচ্ছে তেহরানের গোয়েন্দা দফতর।’’

চলতি বছরের ৪ মার্চ মাঝ-আকাশে একটি ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রকে ধ্বংস করে তুরস্ক। এর নেপথ্যেও ইজ়রায়েলের ‘ভূত’ দেখছে ইরান। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন ইউরোপীয় সামরিক জোট নেটোর সদস্যপদ রয়েছে আঙ্কারার। তেহরানের যুক্তি, ক্ষেপণাস্ত্র হামলার দায় তাদের ঘাড়ে চাপিয়ে তুর্কি ফৌজকে পশ্চিম এশিয়ার রণাঙ্গনে নামানোর পরিকল্পনা ছিল মোসাদের। অভিযোগ, তেহরান ও আঙ্কারার ‘বন্ধুত্বে’ চিড় ধরাতেও চেয়েছে তেল আভিভ।

সামরিক বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করেন, ইজ়রায়েলের সঙ্গে হাত মিলিয়ে ইরানে ‘ফল্স ফ্ল্যাগ’ অপারেশন চালাচ্ছে আমেরিকাও। গত ৯ মার্চ বাহরিনের একটি আবাসিক এলাকায় বিস্ফোরণ ঘটে। ঘটনার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই একে তেহরানের ড্রোনহামলা বলে বিবৃতি দেয় পশ্চিম এশিয়ার মার্কিন কেন্দ্রীয় কমান্ড ‘সেন্টকম’। যদিও পরে জানা যায় সেখানে আছড়ে পড়েছে যুক্তরাষ্ট্রের প্যাট্রিয়ট আকাশ প্রতিরক্ষা (এয়ার ডিফেন্স) ব্যবস্থার ইন্টারসেন্টার রকেট।

এ ছাড়া গত ৫ মার্চ আজ়ারবাইজানের রাজধানী বাকুর বিমানবন্দরে ড্রোনহামলায় আহত হন চার জন। ঘটনার পর ইরানকে দায়ী করে কড়া প্রতিক্রিয়ার হুঁশিয়ারি দেন সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে তৈরি হওয়া দেশটির প্রেসিডেন্ট ইলহাম আলিয়েভ। কিন্তু, সঙ্গে সঙ্গেই একে ইহুদিদের ‘ফল্স ফ্ল্যাগ’ অপারেশন হিসাবে চিহ্নিত করে তেহরান, যা নিয়ে সমাজমাধ্যম প্ল্যাটফর্ম টেলিগ্রামে বিবৃতি দেন পারস্যের বিদেশমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি।

সংশ্লিষ্ট তালিকার একেবারে শেষে আসবে ভারত মহাসাগরের প্রবাল দ্বীপ দিয়েগো গার্সিয়ার প্রসঙ্গ। সেখানকার ব্রিটিশ সামরিক ঘাঁটিতে পঞ্চম প্রজন্মের স্টেল্‌থ শ্রেণির ‘বি-২ স্পিরিট’ বোমারু বিমান মোতায়েন রেখেছে আমেরিকা। গত ২১ মার্চ সেখানে ইরানের ‘ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কোর’ বা আইআরজিসি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে বলে খবর ছড়িয়ে পড়ে। তেহরান থেকে এই দ্বীপের দূরত্ব প্রায় ৪,০০০ কিলোমিটার।মার্কিন প্রশাসনের দুই পদস্থ কর্তাকে উদ্ধৃত করে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে, ইরানের ছোড়া দু’টি ক্ষেপণাস্ত্রের একটি মাঝপথে ব্যর্থ হয়। দ্বিতীয়টিকে থামাতে এসএম-৩ নামের ইন্টারসেন্টর রকেট চালায় ভারত মহাসাগরীয় এলাকায় মোতায়েন থাকা যুক্তরাষ্ট্রের একটি রণতরী। যদিও সরকারি ভাবে এই ইস্যুতে কোনও বিবৃতি দেয়নি ওয়াশিংটনের যুদ্ধ দফতরের (ডিপার্টমেন্ট অফ ওয়ার) সদর কার্যালয় পেন্টাগন।

সৌদি-তুরস্ক-দিয়েগো গার্সিয়ায় হামলা করে ইরানের ঘাড়ে দোষ? তেহরানকে প্যাঁচে ফেলতে ‘মেকি সংগ্রামে’ ইহুদি গুপ্তচরবাহিনী?
সৌদি-তুরস্ক-দিয়েগো গার্সিয়ায় হামলা করে ইরানের ঘাড়ে দোষ? তেহরানকে প্যাঁচে ফেলতে ‘মেকি সংগ্রামে’ ইহুদি গুপ্তচরবাহিনী?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *